পোস্টগুলি

উদরপূর্তি

সকালটা খুব সুন্দর ছিল। কুয়াশা থাকলেও মেঘ ফুড়ে সূর্যের অল্প কিছু আলো গায়ে এসে লাগছে। বাতাসের কারনে অবশ্য ঠান্ডার পরিমান কমেনি। তাপমাত্রা প্রায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত। লং-ড্রাইভে যাওয়ার মত চমৎকার একটা সময়।

আমি অবশ্য খুব বেশি দূরে যাই না। কন্যাকে স্কুলে দিয়ে স্টারে বসে সকালের নাস্তা সারি। এদের চিকেন স্যুপ, খাসির পায়া আর অল্প তেলে ভাজা পরোটা সকালবেলা খুবই উপাদেয় লাগে। সকালবেলা স্টারে লোকজন কম থাকে। কিছু কপোত-কপোতী আর আমার মত দূর্ভাগারা যাদের নাস্তা বানিয়ে দেবার কেউ নাই তারা এখানে খেতে আসে।

স্টারে নাস্তা খেতে ঘন্টা লাগিয়ে দিলেও কেউ কিছু বলে না। আর স্টারই একমাত্র চলনসই রেস্টুরেন্ট যেখানে ভাত-ডাল পাওয়া যায়। আরাম করে বসা যায় দুপুরবেলাতেও।

আমি ভোজন রসিক মানুষ। কেউ যদি একবেলা আমাকে সুস্বাদু খাবার খাওয়ায়, আমি কৃতজ্ঞ হয়ে যাই। নিজেও মাঝে মধ্যে টুকটাক রান্নার চেষ্টা করি। শুধু ডিমভাজা না, আমি ভাত, ডাল, মাংস সবই রান্না করতে পারি। বেঁচে থাকার তাগিদে শিখতে হয়েছে। সারভাইবাল স্কিলের মধ্যে রান্না শেখা সব মানুষের কর্তব্য বলে আমি মনে করি।

সেদিন ইউটিউব থেকে একটা নতুন ডিম ভাজার রেসিপি শিখলাম। 

একটা ডিম ছোট একটা বাটিতে নিতে হবে। বড় এক চামচ মেয়োনিজ সেটাতে যোগ করতে হবে। সল্টেড না হলে ভালো। অল্প একটু ঘি বা তেল সেটার সাথে নিয়ে ভালো করে মেশাতে হবে। এরপর বাটিটা ওভেনে ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের জন্য দিয়ে দিতে হবে।

ব্যাস তৈরি হয়ে যাবে অসাধারন এক অমলেট। প্রতিদিন কি আর সেই তেলেভাজা ডিম পোচ খেতে ভাল লাগে? আমি নিজে একবার এই রেসিপি ট্রাই করে দেখলাম। স্বাদ মন্দ না। হয়ত কিছু গ্রিন চিলি ছোট করে কেটে সাথে দিয়ে দিলে জিনিসটা স্পাইসি হোত।

রান্না হচ্ছে একটা ফিউশন আর্ট। একজনের রেসিপির সাথে আপনি নিজের মনের মত মশলা মেশাবেন। তাতে মাঝে মধ্যে স্বাদ বাড়বে, অথবা জিনিসটা অখাদ্য হবে। কিন্তু আপনাকে এক্সপেরিমেন্ট করতেই হবে। আমাদের জীবনটাও একই রকম। আরেকজনের রেসিপিতে আপনার চলবে না। নিজের বিচার-বুদ্ধিতে আপনাকে সেখানে মশলা মেশাতে হবে। নয়ত আপনি অন্যের মত করেই বেঁচে থাকবেন আজীবন।

এইখানে বলে রাখা ভালো, আমি জীবন থেকে একটা শিক্ষা পেয়েছি। সেটা হচ্ছে, বাসার খাবার যতই অখাদ্য হোক সেটাকে কখনো খারাপ বলা যাবে না। খাবারের বদলে বিষতো আর দিচ্ছে না! রেস্টুরেন্টের শেফ একজন প্রফেশনাল ব্যক্তি। তার হাতের কাজ আর সিজনাল শেফের কাজে তফাত থাকতেই পারে।

খাবারের কথায় আরেকটু বলি, আমি একা খেতে পছন্দ করি। এমনকি রেস্টুরেন্টেও আমি একা যেতে চাই। যদিও বেশিরভাগ সময়েই সেটা হয়ে ওঠে না। মূল কারন মনে হয়, আমি খাবার খাওয়ার সময় অহেতুক কথা বলা পছন্দ করি না সেটা। তবে সঙ্গী যদি বুদ্ধিমান হয় তবে আলোচনা চলতে পারে দর্শন, সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞান নিয়ে। 

ভালো খাবারের মত, ভালো জ্ঞানও সহজে পাচ্য হয়। পৃথিবীর সবকিছু জানার দরকার নেই, সব বিষয়ে পন্ডিত হতে হয় না। আমি যখনই কারও সাথে নাস্তা করতে বসি তিনি রাজনৈতিক জ্ঞান কপচানো শুরু করেন যেটা আমার খুবই অপছন্দের। এই জ্ঞান আবার ফেইসবুক লব্ধ জ্ঞান। বিভিন্ন জনের মতামত থেকে সংগ্রহ করা। অনেকটা পাঁচমিশালি আঁচারের মত। সবার তৈরি আঁচার খেতে ভালো হয় না। মশলার অনুপাত সবাই বোঝে না।

খাবার সময় তাই কম কথা বলাই ভালো।

জুলাই - আবু সাঈদ - মুগ্ধ - হাদি

আধুনিক মানুষের সকল কাজকর্মই অর্থনৈতিক। স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশে বারবার বিপ্লব হয়না। বাংলাদেশে বিগত সময়ে যত উন্নতিই হোক না কেন, অর্থনৈতিক ভাবে দেশের মানুষ সুখী ছিলনা বলেই বিপ্লব হয়েছে। এবং আবারও হবে।

রাজনীতিতে আপনি লোকজনকে তখনই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাতে পারবেন যখন সে মনে করবে বর্তমান অবস্থানে সে সুখী নেই। বাংলাদেশের মানুষ সুখী নয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি অসুখী। এরা ২০২৪ এর সরকার পতনের পর এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। যদিও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখন আর ছাত্রদের তৈরি দলের উপর আর আস্থা রাখছে না। মূল কারন হয়ত দেশের পুরনো সকল প্রথা, পদ্ধতি এবং ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে কথা বলা। 

অনভিজ্ঞ হাতে দেশ চালানো যায় না। অবধারিতভাবে ছাত্ররা ভূল করবে, তাদের ভুল পথে চালিত করা হবে এবং দেশে পুলিশিং এর যে অবস্থা বর্তমানে ছাত্রদের অবস্থাও সেরকম হবে।

মাঝখান থেকে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লাফালাফির কারনে এদের বড় একটা অংশ পড়াশোনা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দুটোই হারাবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের পর বেশ কয়েকজনকে দেশজুড়ে হিরো বানানো হয়েছে। আবু সাঈদ তাদের প্রথমজন, মুগ্ধ দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি।

লাশের রাজনীতির বলি হয়ে এরা এখন অনেকের জন্য নমস্য। কিন্তু ইতিহাস এদের মনে রাখবে কিনা সেটা বড় একটা প্রশ্ন হয়ে গেছে। হাদির মুখের ভাষা রাজনৈতিক নেতার মত ছিল না। গালাগালি এবং চিৎকার দিয়ে জনসম্মুখে তিনি কি প্রমান করতে চাইতেন সেটা জানি না। আমি যৌক্তিক কথা না শুনলে বা যুক্তিতর্কের ধার না যাচাই করতে পারলে কাউকে বড় নেতা বলে মানতে রাজি না। তার দর্শনের সাথেও আমি একমত হই না।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, প্রায় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, মসজিদ থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় হাদি গুলিবিদ্ধ হন। 

২০২৪ এর জুলাইয়ের পরে হাদিকে চিনতাম না, খুব একটা মিডিয়াতেও দেখিনি। ২০২৫ এ তাকে হিরো বানিয়ে এবং পরে হত্যার পর তাকে প্রচুর মিডিয়া কাভারেজ দেয়া হচ্ছে। ঘটনাগুলোর পরম্পরা দেখলে মনে হবে কিছুদিন পর পর একজন করে মানুষকে তারা শহীদ বানানোর ধান্ধায় থাকেন। এরপর শুরু হয় তাকে নিয়ে রাজনীতি আর রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন।

শাহবাগ জায়গাটাকে মোটামুটি ভাবে পঁচিয়ে ফেলা হয়েছে। আওয়ামীলীগ আমলে গণজাগরণ মঞ্চের পর, মৌলবাদীরা এ জায়গাটাকে নিয়ে প্রচুর উপহাস করলেও বর্তমানে শাহবাগ হয়ে গেছে আন্দোলনের তীর্থভূমি। সম্প্রতি এটাকে হাদি চত্বর নাম দেয়া হয়েছে। কয়দিন আগে অবশ্য অন্য নাম ছিল। সে যাই হোক, শাহবাগ আগের জায়গাতেই আছে। মানব সন্তানদের লম্ফঝম্পে তার কিছুই যায় আসে না।

যখনই কোন প্রতিবাদের দরকার পড়ে, তখনই আমরা জানি শাহবাগ বন্ধ হবে আর আশেপাশের তিনটা হাসপাতালের রোগীদের অবস্থা খারাপ হবে এবং শহরবাসী বিশেষ করে পুরান ঢাকাবাসী সেদিন কষ্ট করবে।

 

ডানপন্থীরা একসময় শাহবাগ আন্দোলনকে নিয়ে প্রচুর গালিগালাজ করেছে। এখনও করে তবে পরিমানে কম, কারন এখন তারা নিজেরাই সেখানে বসে থাকে আন্দোলন করার জন্য। শাহবাগে ছেলেমেয়ে একসাথে আন্দোলনরত ছিল বলে মেয়েদের নিয়ে প্রচুর রং-তামাসার কথা তারা ছড়িয়েছিল সেসময়। নিয়তির কি পরিহাস, তারাও এখন রাতজেগে বা ঘুমিয়ে শাহবাগে কাটিয়ে দেয়।

কেউ যদি বলে বাংলাদেশে ডানপন্থী রাজনীতি নাই তবে সে ভুলের রাজ্যে আছে। এখানে চরম ডানপন্থার উত্থান হতে পারেনি কারন বাংলাদেশের একটা শক্ত সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। ডানেরা কখনো এই বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে পারেনি। মৌলবাদের উত্থানের জন্য তাই তাদের রমনা বটমূলে বোমাবাজি করতে হয়, ভয়ে যেন লোকজন পরের বছর থেকে এই সব অনুষ্ঠানে আর না যায়। উদীচী, ছায়ানটে হামলা এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে ২০২৫ সালে এসে। নাটকের মঞ্চে হামলা হয়েছে, শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, বাউল ধরে পেটানো হচ্ছে, মাজারগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে - ইত্যাদি নানা কিছু করার একটাই কারন, জাতিকে সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দেয়া।

ভারত বিরোধিতার ব্যাপারটা অনেক সময় অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ডানপন্থীদের কারনে। এক ফেলানীকে যে রকম হাইলাইট করা হয় রাজনৈতিক কারনে, দেশের ভেতরে এদের কারনে হয়ে যাওয়া খুন আর অগ্নিসংযোগ ততটা গুরুত্ব পায় না। রাজনৈতিক আন্দোলন করতে ইস্যু দরকার হয়। এরা ইস্যু তৈরি করে, তারপর আন্দোলন করে।

মধ্যমপন্থী দল হিসেবে বিএনপির সুনাম থাকলেও, বিগত দিনে জামাতের সাথে মিলে তাদের জোট করাকে অনেকেই ভাল চোখে দেখেনি। আর এবার জামাতের সাথে জোট ভাঙ্গাকে ডানপন্থীরা ভাল চোখে দেখছে না। আওয়ামীলীগ সেকুল্যার দল হিসেবে পরিচিত থেকেও তারা ডানপন্থীদের তোষন করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং তাদের পতনের পর এই মৌলবাদীরা দেশ জুড়ে ক্ষমতার তান্ডব দেখাচ্ছে। এদেরকে দুধ-কলা দিয়ে পুষে আওয়ামীলীগ দেশের এই একটা ক্ষতি অন্তত করে গেছে দীর্ঘ মেয়াদে।

আমি এখনও পর্যন্ত এদেশে এমন একটা রাজনৈতিক দল দেখিনি যারা জোর গলায় বলবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এখানে সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। রাজনীতি করতে হবে যুক্তি আর তর্ক দিয়ে, আবেগ আর লোভ থেকে নয়। ২০২৫ বিদায় নিচ্ছে, সামনে ভোট হবার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বাংলাদেশ বসে আছে জ্বলন্ত উনুনের উপর।

গণতন্ত্র সবচেয়ে আরাধ্য শাসন ব্যবস্থা হলেও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য এটি হিতে বিপরীত হয়। কারন একজন যোগ্য শাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাই এদেশের জনগণ জানে না। এখানে যে বেশি চিল্লায় আর মাঠ গরম রাখতে পারে সেই ভোটে নির্বাচিত হয়। যিনি সবচেয়ে দক্ষ বা যৌক্তিক তাকে রাখা হয় খেলার বাইরে। 

২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
ঢাকা, বাংলাদেশ । 

The Wind of Change - হাওয়া বদল

সকল সাম্রাজ্যের একদিন শেষ হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। 

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দীর্ঘ পনের বছর পর। আওয়ামীলীগ আর ক্ষমতায় নেই। কিন্তু এখন দেশ কারা চালাচ্ছে সেটা বোঝাটা খুব দূরহ হয়ে গেছে। জামায়াত নাকি বিএনিপি - কে আসবে ক্ষমতায় এটা নিয়ে চলছে বিতর্ক। টকশোগুলোতে গরম গরম বক্তৃতা রেখে যাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ক্ষমতার অত গহীনের মারপ্যাঁচ বোঝাটা সাধারণের জন্য খুব কষ্টের।

ক্ষমতার শূন্যস্থান তৈরি হলে সেখানে সবসময়ই উগ্রবাদ স্থান নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংবাদগুলো দেখলে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। মাজার পোড়ানো হয়েছে, মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দেয়া হয়েছে, বাউলদের ধরে পেটানো হচ্ছে, বিরোধী মতের কাউকে পেলে জবাই করে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একটা সভ্য সমাজ বলতে আদতে যা বোঝায় সেটার কোন অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

কারো কথা ভালো লাগে না বলে তাকে স্বৈরাচার বলার একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। মোদ্দা কথা চরম ডানপন্থার উত্থানের যা যা উপসর্গ তার সবকিছুই বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

ধর্মের নামে কারা অধর্ম চালায় সবাই তা জানে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না। কারন বাকস্বাধীনতার থেকে জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। ধর্ম-ছাগলদের রোখার তাই কেউ নাই। এরা বিভিন্ন দলে ভাগে হয়ে একসময় সবাইকে আক্রমন করে বসবে।  হয়ত এমন একদিন আসবে যেদিন ছবি আকাঁর জন্য বা কবিতা লেখার জন্যও ধরে ধরে সবাইকে পেটানো হবে।

ওহ... আমি মনে হয় ভুল বললাম। লেখালেখির জন্য ইতিমধ্যেই এদেশে অনেকের জীবন গেছে, বাকিরা পালিয়ে বেঁচেছে। এদেশেই কবিতা লেখার জন্য দেশান্তরি হতে হয়েছে কবিকে, ধার্মিকের কোপ খেতে হয়েছে। ছবি আঁকার জন্য কার্টুনিস্ট জেলে গেছে।

ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করবে, কিন্তু এদেশের শাসকেরা সেখান থেকে শিখবে না। জ্ঞানের পরিচর্যা না করে যেখানে অন্ধবিশ্বাসকে তোষন করা হয় - সেখান থেকে বড় বড় বিপ্লবী তৈরি হবে, বিজ্ঞানী নয়। 

হয়ত তিরিশ বছর পরে এই সময়টার কথা যখন কেউ পড়বে সে ভাববে দেশে তখন খুব বড় একটা সংস্কার  চলছিল। ব্যপারটা আসলে সেটাও নয়। একটা গোলমাল চলছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ঠিক করা নিয়ে, কিন্তু আমি খুব আশাবাদী যে সত্য একদিন জিতে যাবে। সত্য খুব কঠিন আর অপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু আপনাকে শেষ পর্যন্ত তার দ্বারস্থ হতেই হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় - ১৯৭১ কে মুছে ফেলার একটা আপ্রান চেষ্টা চলছে জেনজি প্রজন্মের হাত ধরে। ইতিহাস মুছে ফেলা না গেলেও তাকে বিকৃত করা বা তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ২০২৪ কে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টা নতুন নয়। যদিও এটা সফল হবে না। 

অশিক্ষিতের দেশে গণতন্ত্র সবসময় একটা দূর্বল শাসন ব্যবস্থা। সেই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সবাই বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছে। কে যে আসল বন্ধু সেটা চেনাটাই দুষ্কর। তবুও আমাদের গণতন্ত্র আকঁড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে, খেলাফত, স্বৈরতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্র নয়।

আশা রাখি একদিন আবার বাউলের দেশে একতারা কথা বলবে। লালন বা নজরুলকে কেউ রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে দাঁড় করাবে না। মানুষ যুক্তি আর বিশ্লেষণের পথে হাঁটবে।

 

২৫ নভেম্বর, ২০২৫
ঢাকা ।

 

 

ক্ষমতা

ক্ষমতা হচ্ছে দায়িত্বের মত। আপনি যখনই ক্ষমতা পেয়ে তার অপব্যবহার করবেন, এটা কবর পর্যন্ত আপনাকে তাড়া করবে।

 


আমাদের কৈশোরের স্রষ্টার মৃত্যু

রকিব হাসান মারা গেছেন। আমাদের কৈশোরে তার ছবি দেখে আমরা তাকে চিনতাম না। তিন গোয়েন্দার বইয়ে শুধু তার নাম থাকত। নব্বই দশকের কয়েকটা প্রজন্মের কাছে তার নামটাই একটা কাল্টের মত ছিল। রকিব হাসানের নামেই যে কোন বই চলত।

২০২২ এ মারা গেলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তার একবছর আগে শেখ আবদুল হাকিম আর এখন রকিব হাসান। কয়েক প্রজন্মকে যারা বইপড়া শিখিয়েছিলেন তারা একে একে চলে গেছেন। আমাদের কৈশোরের সুপারহিরোরা সবাই অতীত হয়ে গেছেন। মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালী বলতে আমরা যাদের বুঝি তাদের মানসিক বিকাশে এই তিনজনের অবদান অসীম। আমরা এখন মধ্য বয়সে আছি। আমাদের বয়স এখন চল্লিশ বা তার বেশি। বিয়ে-থা করে সবাই থিতু হয়েছে নিরামিষ জীবনে। কিন্তু যতদিন আমরা বেঁচে থাকব আর এই নামগুলো শুনব, আমরা ফিরে যাব রঙিন কৈশোরে।

আমি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল চেনার আগে এদের চিনেছিলাম। তিন গোয়েন্দার কাল্পনিক অভিযানে কতবার নিজেকে কল্পনা করে হারিয়ে গিয়েছিলাম লস এঞ্জেলস রকি বিচে। মাসুদ রানার সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবী। বুনো পশ্চিমে চালিয়েছিলাম ঘোড়া।

আমাদের সময় ইন্টারনেট ছিলো না। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছিলনা বলে আমাদের মনযোগ বিক্ষিপ্ত ভাবে সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ত না। আমাদের মনোরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। উত্তেজনা আর কল্পনার মিশেলে গড়া একটা অদ্ভুত দুনিয়া।

বর্তমানের কিশোরেরা যাদের টিকটকে নাচানাচি আর রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ানোটা নেশা, তারা আমাদের এই আবেগ বুঝতে পারবে না।

মানুষ জন্মায় আবার মরে যায়, কিন্তু কজন মানুষ ইতিহাসের অংশ হতে পারে? রকিব হাসান আপনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন। স্রষ্টার মৃত্যু হয় বারবার কিন্তু তার সৃষ্টির মাঝেই তিনি বেঁচে ওঠেন আবার। 

হাসপাতালে ঈশ্বর অনুপস্থিত থাকেন, প্রার্থনায় থাকে মানুষ

জীবনের একটা ব্যাস্ত সময় পার করেছি। হাসপাতাল আর বাসা করতে করতেই সারাদিন শেষ। এইদিকে ক্লায়েন্টের প্রোগ্রাম্যাটিক সমস্যা সমাধানের তাড়া অন্যদিকে আরেকজনের জীবন-মৃত্যু ছুয়ে ফিরে আসা। গত দশ বছরে আমাকে যে পরিমান হাসপাতালে দোড়াদৌড়ি করতে হয়েছে এই পরিমান শ্রম আর সময় নিয়ম করে আমি অন্যকিছুতে দেইনি।

কয়দিন আগে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে নিয়ে গেলাম ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে। ইমার্জেন্সি থেকে একটা কেবিনে শিফট করতেই সারাদিন পার। এরপর শুরু হল টেস্টের ধাক্কা। প্রায় দু'লাখ টাকার লম্বা একটা বিল নিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে সুস্থ করে আনলাম।

এরা বিল পেইড করার আগে হাসপাতাল থেকে রোগী বের হতে দেয় না। কেউই দেয় না। কাস্টমার একবার চলে গেলে যদি বিল না দেয়া হয়! হাসপাতাল থেকে রিলিজের দিন শুক্রবার ছিল। আমার মা অস্থির ছিল বাসায় ফেরার জন্য, আর তাদের তখন জুম্মার নামাজের তাড়া, কাউণ্টার বন্ধ হয়ে গেছে। নামাজের পর বিল পে করে রিলিজ নিতে হবে। আমি যতই বলি রিলিজ নিয়ে রোগী চলে যাক, আমি বিল পে করার জন্য থাকি। তারা মানতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত আমার ব্যাংকের কার্ড আর ভিজিটিং কার্ড জমা রাখলাম। তারপর রিলিজ দিল। 

এই দেশে আসলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এর আগে হয়ত তাদের বিল না দিয়ে কেউ পালিয়ে গিয়েছিল। যদিও এরাই একবার ভুল করেছিল আর কিছু টাকা বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমাকে ফোন করার পর আমি নিজে গিয়ে তাদের সেই বিল পরিশোধ করে এসেছিলাম। 

ল্যাব এইড হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে মাত্র তিরিশ মিনিটের জন্য আমার মাকে রাখতে হয়েছিল সেখানে প্রায় সাত হাজার টাকা বিল করেছিল। 

তারপরেও মন্দের ভালো রোগী নিয়ে গেলে ইমার্জেন্সিতে সেবা পাওয়া যায়। তার জন্য আপনার দরকার হবে টাকা। টাকা থাকলে এই দেশে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সব হাসপাতাল আর ডাক্তারই কি খারাপ? 

অবশ্যই না। এই দেশে আমি এমন অনেক স্পেশালিষ্ট ডাক্তার দেখেছি যারা মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে রোগী দেখেন। বিনা পয়সায় ট্রান্সপ্লান্টের মত জটিল সব অপারেশন করান। ফ্রি-তে টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করে দেন। স্যাম্পলের ঔষধ রোগীদের দিয়ে দেন। 

মিরপুরের কিডনি ফাউণ্ডেশন কিংবা শ্যামলীর সিকেডি হাসপাতালে প্রচুর রোগি হয়। এখানে নুন্যতম খরচে দেশের সেরা কিছু ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে শ্যামলীর সিকেডিতে ঔষধের দামও অন্যজায়গার থেকে কম। হ্যাটস অফ টু দেম।

ঢালাওভাবে সবাইকে খারাপ কিভাবে বলি? কিন্তু ভালোরা আড়াল হয়ে যায় কর্পোরেট হাসপাতালের আড়ালে। স্বাস্থ্য সেবা একটা ব্যবসা এইখানে। স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারই এই মৌলিক অধিকারকে ফ্রি করতে পারেনি। নূন্যতম সেবা পেতে হলেও আপনাকে খরচ করতে হবে অর্থ।

এর একটা কারন হতে পারে, আমাদের কোন সরকারই দেশের মানুষইকে মানুষ মনে করেনি। এখনও করে না। আপনি সরকারি মেডিকেল গুলোতে যান, সেখানে লাশ বের করতে হলেও আপনাকে স্ট্রেচারের জন্য পে করতে হবে। জীবিত মানুষ মৃত মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করে।

একটু সামর্থ্যবান হলে তাই কেউ সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় যেতে চায় না। মানুষ ব্যবসা করে মানুষকে নিয়ে, জীবন আর মৃত্যু নিয়ে। সৃষ্টিকর্তা হাসপাতালে না থাকলেও, তাকে ডেকে যায় অনবরত রাত জেগে থাকা রোগীর আত্মীয়স্বজন।

স্কয়ার বা এভার কেয়ারের মত ফাইভস্টার হাসপাতালে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বেঁচে থাকতে একবার দেখার ইচ্ছা আছে। টাকা ঈশ্বরের থেকে কত বেশি শক্তিশালী সেটা নিজের চোখে দেখার খুব ইচ্ছা।

 

 

আমাদের ব্যর্থ রাষ্ট্র

এইটা একটা বিখ্যাত ছবি হতে যাচ্ছে। কারন প্রতিদিনতো আকাশ থেকে টুপ করে বিমান পড়ে স্কুলের বাচ্চা মারা যায় না! তাই এইরকম ধবংসস্তুপ দেখতে পাওয়াটা দূর্লভ।

সোমবার ২১শে জুলাই, বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষন বিমান ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের উপর গিয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যা কেউ সঠিক বলছে না। তবে গোনা যাবে একসময়। কারন স্কুলের বাচ্চাদের পরিবার আছে, হাজিরার সিস্টেম আছে।

আমি সারাদিন অনেক কিছু লেখার চেষ্টা করেও লিখতে পারিনি। কোন কাজও করতে পারিনি গত দুইদিন। মানুষের সীমাহীন অভিযোগ আর একে অপরের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা দেখছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিহত বৈমানিককে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত করা হয়েছে। মৃত বাচ্চাদের যাদের দেহ পাওয়া গিয়েছে পরিবারের লোকজন নিজের মত করে সৎকার করেছেন। রাষ্ট্র চুপ হয়ে আছে। অসভ্য রাষ্ট্র, আ ফেইল্ড স্টেইট।

পৃথিবীর যেকোন উন্নত রাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তার বাচ্চাদের বাচানোর জন্য। তাদের জন্য আলাদা স্কুল বাস, সেটা অতিক্রম করলে কঠিন জরিমানার ব্যবস্থা থাকে। স্কুলের আশেপাশে অনেক জায়গা জুড়ে নিরাপত্তা বলয়, মাইনর হিসেবে তাকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া, যাতে ঠিকমত পড়াশোনা করতে পারে সেজন্য যা যা করা দরকার, ইত্যাদি হাজার রকম বিষয় নিয়ে তারা কাজ করে।

যদি সেখানে এরকম ট্র্যাজেডি হত তবে এতক্ষনে তাদের সরকার নড়েচড়ে বসত অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করত। ভাগ্যিস আমাদের কোন সরকার নেই। আমাদের আছে শিক্ষার নামে ব্যবসা আর দেশপ্রেমের নামে ইতরামি। 

আমরা আমাদের বাচ্চাদের শিখিয়েছি রাস্তায় আন্দোলন আর নেতা হতে হলে কি করতে হয় সেটা। We have failed our children. 

একটা জাতি ধর্মের নামে নোংরামি করে, জাতীয়বাদের চেতনায় দূর্নীতি করে, কেউ বিপদে পড়লে তামাশা দেখে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সারা পৃথিবীর থেকে পিছিয়ে, নূন্যতম সিভিক সেন্স নাই - এইখানে এর থেকে বড় দূর্যোগ আসলে ব্লাডি সিভিলিয়ান হাজারে হাজারে মরবে।

আঙ্গুল তুলে ভুল দেখিয়ে দেবার হাজারটা জায়গা আছে। আজকে কিছুই করতে চাচ্ছি না। খুব ক্লান্ত লাগছে। গত জুলাই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ মরছে।

রাষ্ট্র বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব নেই। যেখানে একদল মানুষের চিন্তার প্রতিফলন ঘটে সেটাই রাষ্ট্র। আমাদের চিন্তা অস্বচ্ছ, অসৎ, লোভাতুর আর ধার্মিক। 

দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সেটা ঘটার উপকরণ যদি রাষ্ট্র ছড়িয়ে রাখে তবে সেই রাষ্ট্র একটা বাতিল চিন্তা-ভাবনা নিয়ে এগুচ্ছে। বাংলাদেশ একটা মৃত্যুপুরী, এইখানে বেঁচে থাকাটাই একটা যুদ্ধের মত। এটাই প্রথম বা শেষ নয়, সামনে আরো দূর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সবকিছু একটা চেইন রি-অ্যাকশনের মত  কাজ করে।