পোস্টগুলি

The Wind of Change - হাওয়া বদল

সকল সাম্রাজ্যের একদিন শেষ হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। 

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দীর্ঘ পনের বছর পর। আওয়ামীলীগ আর ক্ষমতায় নেই। কিন্তু এখন দেশ কারা চালাচ্ছে সেটা বোঝাটা খুব দূরহ হয়ে গেছে। জামায়াত নাকি বিএনিপি - কে আসবে ক্ষমতায় এটা নিয়ে চলছে বিতর্ক। টকশোগুলোতে গরম গরম বক্তৃতা রেখে যাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ক্ষমতার অত গহীনের মারপ্যাঁচ বোঝাটা সাধারণের জন্য খুব কষ্টের।

ক্ষমতার শূন্যস্থান তৈরি হলে সেখানে সবসময়ই উগ্রবাদ স্থান নেয়। বাংলাদেশের বর্তমান সংবাদগুলো দেখলে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। মাজার পোড়ানো হয়েছে, মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা দেয়া হয়েছে, বাউলদের ধরে পেটানো হচ্ছে, বিরোধী মতের কাউকে পেলে জবাই করে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একটা সভ্য সমাজ বলতে আদতে যা বোঝায় সেটার কোন অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

কারো কথা ভালো লাগে না বলে তাকে স্বৈরাচার বলার একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। মোদ্দা কথা চরম ডানপন্থার উত্থানের যা যা উপসর্গ তার সবকিছুই বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

ধর্মের নামে কারা অধর্ম চালায় সবাই তা জানে। কিন্তু মুখ ফুটে বলে না। কারন বাকস্বাধীনতার থেকে জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। ধর্ম-ছাগলদের রোখার তাই কেউ নাই। এরা বিভিন্ন দলে ভাগে হয়ে একসময় সবাইকে আক্রমন করে বসবে।  হয়ত এমন একদিন আসবে যেদিন ছবি আকাঁর জন্য বা কবিতা লেখার জন্যও ধরে ধরে সবাইকে পেটানো হবে।

ওহ... আমি মনে হয় ভুল বললাম। লেখালেখির জন্য ইতিমধ্যেই এদেশে অনেকের জীবন গেছে, বাকিরা পালিয়ে বেঁচেছে। এদেশেই কবিতা লেখার জন্য দেশান্তরি হতে হয়েছে কবিকে, ধার্মিকের কোপ খেতে হয়েছে। ছবি আঁকার জন্য কার্টুনিস্ট জেলে গেছে।

ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করবে, কিন্তু এদেশের শাসকেরা সেখান থেকে শিখবে না। জ্ঞানের পরিচর্যা না করে যেখানে অন্ধবিশ্বাসকে তোষন করা হয় - সেখান থেকে বড় বড় বিপ্লবী তৈরি হবে, বিজ্ঞানী নয়। 

হয়ত তিরিশ বছর পরে এই সময়টার কথা যখন কেউ পড়বে সে ভাববে দেশে তখন খুব বড় একটা সংস্কার  চলছিল। ব্যপারটা আসলে সেটাও নয়। একটা গোলমাল চলছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ঠিক করা নিয়ে, কিন্তু আমি খুব আশাবাদী যে সত্য একদিন জিতে যাবে। সত্য খুব কঠিন আর অপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু আপনাকে শেষ পর্যন্ত তার দ্বারস্থ হতেই হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় - ১৯৭১ কে মুছে ফেলার একটা আপ্রান চেষ্টা চলছে জেনজি প্রজন্মের হাত ধরে। ইতিহাস মুছে ফেলা না গেলেও তাকে বিকৃত করা বা তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ২০২৪ কে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টা নতুন নয়। যদিও এটা সফল হবে না। 

অশিক্ষিতের দেশে গণতন্ত্র সবসময় একটা দূর্বল শাসন ব্যবস্থা। সেই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সবাই বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছে। কে যে আসল বন্ধু সেটা চেনাটাই দুষ্কর। তবুও আমাদের গণতন্ত্র আকঁড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে, খেলাফত, স্বৈরতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্র নয়।

আশা রাখি একদিন আবার বাউলের দেশে একতারা কথা বলবে। লালন বা নজরুলকে কেউ রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে দাঁড় করাবে না। মানুষ যুক্তি আর বিশ্লেষণের পথে হাঁটবে।

 

২৫ নভেম্বর, ২০২৫
ঢাকা ।

 

 

ক্ষমতা

ক্ষমতা হচ্ছে দায়িত্বের মত। আপনি যখনই ক্ষমতা পেয়ে তার অপব্যবহার করবেন, এটা কবর পর্যন্ত আপনাকে তাড়া করবে।

 


আমাদের কৈশোরের স্রষ্টার মৃত্যু

রকিব হাসান মারা গেছেন। আমাদের কৈশোরে তার ছবি দেখে আমরা তাকে চিনতাম না। তিন গোয়েন্দার বইয়ে শুধু তার নাম থাকত। নব্বই দশকের কয়েকটা প্রজন্মের কাছে তার নামটাই একটা কাল্টের মত ছিল। রকিব হাসানের নামেই যে কোন বই চলত।

২০২২ এ মারা গেলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তার একবছর আগে শেখ আবদুল হাকিম আর এখন রকিব হাসান। কয়েক প্রজন্মকে যারা বইপড়া শিখিয়েছিলেন তারা একে একে চলে গেছেন। আমাদের কৈশোরের সুপারহিরোরা সবাই অতীত হয়ে গেছেন। মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালী বলতে আমরা যাদের বুঝি তাদের মানসিক বিকাশে এই তিনজনের অবদান অসীম। আমরা এখন মধ্য বয়সে আছি। আমাদের বয়স এখন চল্লিশ বা তার বেশি। বিয়ে-থা করে সবাই থিতু হয়েছে নিরামিষ জীবনে। কিন্তু যতদিন আমরা বেঁচে থাকব আর এই নামগুলো শুনব, আমরা ফিরে যাব রঙিন কৈশোরে।

আমি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল চেনার আগে এদের চিনেছিলাম। তিন গোয়েন্দার কাল্পনিক অভিযানে কতবার নিজেকে কল্পনা করে হারিয়ে গিয়েছিলাম লস এঞ্জেলস রকি বিচে। মাসুদ রানার সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবী। বুনো পশ্চিমে চালিয়েছিলাম ঘোড়া।

আমাদের সময় ইন্টারনেট ছিলো না। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছিলনা বলে আমাদের মনযোগ বিক্ষিপ্ত ভাবে সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ত না। আমাদের মনোরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। উত্তেজনা আর কল্পনার মিশেলে গড়া একটা অদ্ভুত দুনিয়া।

বর্তমানের কিশোরেরা যাদের টিকটকে নাচানাচি আর রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ানোটা নেশা, তারা আমাদের এই আবেগ বুঝতে পারবে না।

মানুষ জন্মায় আবার মরে যায়, কিন্তু কজন মানুষ ইতিহাসের অংশ হতে পারে? রকিব হাসান আপনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন। স্রষ্টার মৃত্যু হয় বারবার কিন্তু তার সৃষ্টির মাঝেই তিনি বেঁচে ওঠেন আবার। 

হাসপাতালে ঈশ্বর অনুপস্থিত থাকেন, প্রার্থনায় থাকে মানুষ

জীবনের একটা ব্যাস্ত সময় পার করেছি। হাসপাতাল আর বাসা করতে করতেই সারাদিন শেষ। এইদিকে ক্লায়েন্টের প্রোগ্রাম্যাটিক সমস্যা সমাধানের তাড়া অন্যদিকে আরেকজনের জীবন-মৃত্যু ছুয়ে ফিরে আসা। গত দশ বছরে আমাকে যে পরিমান হাসপাতালে দোড়াদৌড়ি করতে হয়েছে এই পরিমান শ্রম আর সময় নিয়ম করে আমি অন্যকিছুতে দেইনি।

কয়দিন আগে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে নিয়ে গেলাম ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে। ইমার্জেন্সি থেকে একটা কেবিনে শিফট করতেই সারাদিন পার। এরপর শুরু হল টেস্টের ধাক্কা। প্রায় দু'লাখ টাকার লম্বা একটা বিল নিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে সুস্থ করে আনলাম।

এরা বিল পেইড করার আগে হাসপাতাল থেকে রোগী বের হতে দেয় না। কেউই দেয় না। কাস্টমার একবার চলে গেলে যদি বিল না দেয়া হয়! হাসপাতাল থেকে রিলিজের দিন শুক্রবার ছিল। আমার মা অস্থির ছিল বাসায় ফেরার জন্য, আর তাদের তখন জুম্মার নামাজের তাড়া, কাউণ্টার বন্ধ হয়ে গেছে। নামাজের পর বিল পে করে রিলিজ নিতে হবে। আমি যতই বলি রিলিজ নিয়ে রোগী চলে যাক, আমি বিল পে করার জন্য থাকি। তারা মানতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত আমার ব্যাংকের কার্ড আর ভিজিটিং কার্ড জমা রাখলাম। তারপর রিলিজ দিল। 

এই দেশে আসলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এর আগে হয়ত তাদের বিল না দিয়ে কেউ পালিয়ে গিয়েছিল। যদিও এরাই একবার ভুল করেছিল আর কিছু টাকা বাকি রয়ে গিয়েছিল। আমাকে ফোন করার পর আমি নিজে গিয়ে তাদের সেই বিল পরিশোধ করে এসেছিলাম। 

ল্যাব এইড হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে মাত্র তিরিশ মিনিটের জন্য আমার মাকে রাখতে হয়েছিল সেখানে প্রায় সাত হাজার টাকা বিল করেছিল। 

তারপরেও মন্দের ভালো রোগী নিয়ে গেলে ইমার্জেন্সিতে সেবা পাওয়া যায়। তার জন্য আপনার দরকার হবে টাকা। টাকা থাকলে এই দেশে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সব হাসপাতাল আর ডাক্তারই কি খারাপ? 

অবশ্যই না। এই দেশে আমি এমন অনেক স্পেশালিষ্ট ডাক্তার দেখেছি যারা মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে রোগী দেখেন। বিনা পয়সায় ট্রান্সপ্লান্টের মত জটিল সব অপারেশন করান। ফ্রি-তে টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করে দেন। স্যাম্পলের ঔষধ রোগীদের দিয়ে দেন। 

মিরপুরের কিডনি ফাউণ্ডেশন কিংবা শ্যামলীর সিকেডি হাসপাতালে প্রচুর রোগি হয়। এখানে নুন্যতম খরচে দেশের সেরা কিছু ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে শ্যামলীর সিকেডিতে ঔষধের দামও অন্যজায়গার থেকে কম। হ্যাটস অফ টু দেম।

ঢালাওভাবে সবাইকে খারাপ কিভাবে বলি? কিন্তু ভালোরা আড়াল হয়ে যায় কর্পোরেট হাসপাতালের আড়ালে। স্বাস্থ্য সেবা একটা ব্যবসা এইখানে। স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারই এই মৌলিক অধিকারকে ফ্রি করতে পারেনি। নূন্যতম সেবা পেতে হলেও আপনাকে খরচ করতে হবে অর্থ।

এর একটা কারন হতে পারে, আমাদের কোন সরকারই দেশের মানুষইকে মানুষ মনে করেনি। এখনও করে না। আপনি সরকারি মেডিকেল গুলোতে যান, সেখানে লাশ বের করতে হলেও আপনাকে স্ট্রেচারের জন্য পে করতে হবে। জীবিত মানুষ মৃত মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করে।

একটু সামর্থ্যবান হলে তাই কেউ সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় যেতে চায় না। মানুষ ব্যবসা করে মানুষকে নিয়ে, জীবন আর মৃত্যু নিয়ে। সৃষ্টিকর্তা হাসপাতালে না থাকলেও, তাকে ডেকে যায় অনবরত রাত জেগে থাকা রোগীর আত্মীয়স্বজন।

স্কয়ার বা এভার কেয়ারের মত ফাইভস্টার হাসপাতালে যাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বেঁচে থাকতে একবার দেখার ইচ্ছা আছে। টাকা ঈশ্বরের থেকে কত বেশি শক্তিশালী সেটা নিজের চোখে দেখার খুব ইচ্ছা।

 

 

আমাদের ব্যর্থ রাষ্ট্র

এইটা একটা বিখ্যাত ছবি হতে যাচ্ছে। কারন প্রতিদিনতো আকাশ থেকে টুপ করে বিমান পড়ে স্কুলের বাচ্চা মারা যায় না! তাই এইরকম ধবংসস্তুপ দেখতে পাওয়াটা দূর্লভ।

সোমবার ২১শে জুলাই, বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষন বিমান ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের উপর গিয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যা কেউ সঠিক বলছে না। তবে গোনা যাবে একসময়। কারন স্কুলের বাচ্চাদের পরিবার আছে, হাজিরার সিস্টেম আছে।

আমি সারাদিন অনেক কিছু লেখার চেষ্টা করেও লিখতে পারিনি। কোন কাজও করতে পারিনি গত দুইদিন। মানুষের সীমাহীন অভিযোগ আর একে অপরের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা দেখছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিহত বৈমানিককে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত করা হয়েছে। মৃত বাচ্চাদের যাদের দেহ পাওয়া গিয়েছে পরিবারের লোকজন নিজের মত করে সৎকার করেছেন। রাষ্ট্র চুপ হয়ে আছে। অসভ্য রাষ্ট্র, আ ফেইল্ড স্টেইট।

পৃথিবীর যেকোন উন্নত রাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তার বাচ্চাদের বাচানোর জন্য। তাদের জন্য আলাদা স্কুল বাস, সেটা অতিক্রম করলে কঠিন জরিমানার ব্যবস্থা থাকে। স্কুলের আশেপাশে অনেক জায়গা জুড়ে নিরাপত্তা বলয়, মাইনর হিসেবে তাকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া, যাতে ঠিকমত পড়াশোনা করতে পারে সেজন্য যা যা করা দরকার, ইত্যাদি হাজার রকম বিষয় নিয়ে তারা কাজ করে।

যদি সেখানে এরকম ট্র্যাজেডি হত তবে এতক্ষনে তাদের সরকার নড়েচড়ে বসত অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করত। ভাগ্যিস আমাদের কোন সরকার নেই। আমাদের আছে শিক্ষার নামে ব্যবসা আর দেশপ্রেমের নামে ইতরামি। 

আমরা আমাদের বাচ্চাদের শিখিয়েছি রাস্তায় আন্দোলন আর নেতা হতে হলে কি করতে হয় সেটা। We have failed our children. 

একটা জাতি ধর্মের নামে নোংরামি করে, জাতীয়বাদের চেতনায় দূর্নীতি করে, কেউ বিপদে পড়লে তামাশা দেখে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সারা পৃথিবীর থেকে পিছিয়ে, নূন্যতম সিভিক সেন্স নাই - এইখানে এর থেকে বড় দূর্যোগ আসলে ব্লাডি সিভিলিয়ান হাজারে হাজারে মরবে।

আঙ্গুল তুলে ভুল দেখিয়ে দেবার হাজারটা জায়গা আছে। আজকে কিছুই করতে চাচ্ছি না। খুব ক্লান্ত লাগছে। গত জুলাই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ মরছে।

রাষ্ট্র বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব নেই। যেখানে একদল মানুষের চিন্তার প্রতিফলন ঘটে সেটাই রাষ্ট্র। আমাদের চিন্তা অস্বচ্ছ, অসৎ, লোভাতুর আর ধার্মিক। 

দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সেটা ঘটার উপকরণ যদি রাষ্ট্র ছড়িয়ে রাখে তবে সেই রাষ্ট্র একটা বাতিল চিন্তা-ভাবনা নিয়ে এগুচ্ছে। বাংলাদেশ একটা মৃত্যুপুরী, এইখানে বেঁচে থাকাটাই একটা যুদ্ধের মত। এটাই প্রথম বা শেষ নয়, সামনে আরো দূর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সবকিছু একটা চেইন রি-অ্যাকশনের মত  কাজ করে।

 

অ-সুখ বিলাস

প্রায় তিনবছর পর তিনদিন জ্বরে ভুগলাম। আমি ধারনা করেছি চিকেন গুনিয়া। 

সাধারনত আমি জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি-কাশি এইগুলোতে ভুগি না। ছোটবেলায় এতবার অসুস্থ হয়েছি যে আমার ধারনা আমার বডিতে ইতিমধ্যে হাজার হাজার এন্টিবডি তৈরি হয়ে বসে আছে। নতুন করে ভাইরাস ঢুকতে গেলেই বলে - এই ব্যাটা তোকে তো চিনি। তুই আবার এসেছিস?

অসুস্থতা এবার কিছুটা উপভোগ করেছি। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এই তিনদিনের বেশিরভাগ  সময়ই আমি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। কারন আমাদের শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি। রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, প্রোটিন তৈরি করে আক্রান্ত স্থানের জন্য নতুন কোষ তৈরি, সেল রিপেয়ার ইত্যাদি নানা কাজে সে তখন মনযোগ দিতে পারে। ঘুম তাই উত্তম চিকিৎসা।

চিকেন গুনিয়ার নামে কেন "চিকেন" আছে এটা আমি জানি না। তবে মারাত্বক বিরক্তিকর একটা জ্বর। সারা শরীরের জয়েন্ট এ ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। মানুষের আদি পুরুষের মত এই ভাইরাসও (CHIKV) আফ্রিকা থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে।

ক্লায়েন্টের নতুন কোন কাজ ছিলনা। নিজের লেখালেখি থেকেও ছুটি। সেই সাথে বাইরে তুমুল বৃষ্টি আর জ্বরের ঘোরে একটা নেশাতুর অবস্থা, সব মিলিয়ে সোনায় সোহাগা যাকে বলে।  

"আমি সহজে অসুস্থ হই না" - এই কথাটা যতবার আমি বলি, আমার আশেপাশের বন্ধুবান্ধব খুব বিরক্ত হয়। তারা মনে করে আমি নিজেকে সুপারম্যান দাবি করছি। ব্যাপারটা আসলে সেরকম না। জীবন যাপনে আমি কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করি আমাদের বেশিরভাগ সমস্যা খাবার থেকেই শুরু হয়। আমি খুব পরিমিত আহার করি। বাধ্য না হলে আমি বাইরের খাবার খেতে চাই না। বুদ্ধি হবার পর থেকে রাস্তায় বানানো খাবার খাই না।

আমি চিনি খাই না। মিষ্টি জাতীয় যেকোন জিনিস থেকে আমি দশহাত দূরে থাকার চেষ্টা করি। ফ্রিজে কোন খাবার দুই দিনের বেশি থাকলে আমি আর সেটা খাই না। বাসার ফ্রিজে যদি কেউ খোলা পাত্রে খাবার রাখে, আমি সেটাও ফেলে দেই। ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের অভাব নাই আমাদের ফ্রিজে। এরা খুব আরামে থাকে ফ্রিজের তাপমাত্রায়। সেখানে খোলা পাত্রে খাবার রাখাটা একধরনের অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

এখন খেতে হলে আমি এখনই রান্না করার লোক। রান্না করে পরে খাবো এই চিন্তাটা আমাকে পীড়া দেয়। 

আমি আসলে অসুস্থ হতে চাই না। কয়দিন আগেই মাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদোড়ি করতে হয়েছে সপ্তাহখানেক। হাসপাতালে আমাকে প্রতিমাসে অন্যদের জন্য এতবার যেতে হয় যে আমার হাসপাতাল ভীতি ধরে গেছে একরকমের। আমি জানি আমি অসুস্থ হলে আসলে আমাকে সেবা করার কেউ নেই। আমার কাজগুলো করার কেউ নেই। আমার খাবার বানিয়ে দেবার কেউ নেই, আমার আবদার রক্ষা করার লোক নেই।

বড় হবার একটা ভীষণ যন্ত্রনা আছে। আপনি স্বাধীনতা পাবেন কিন্তু সেটা অন্যেরা কেড়ে নেবে। আপনার সময় কেড়ে নেবে ভালোবাসার নামে। উপার্জিত অর্থ কেড়ে নেবে দায়িত্বের নামে। আমি তাই অসুস্থ হতে চাই না, কারন আমাকে দেখে রাখার কেউ নাই।

মৃদু জ্বর, মাথা ব্যাথা, সর্দি কাশি, পেট ব্যাথা, মন খারাপ ইত্যাদি তাই আমার কখনো হয় না। আমি সহজে অসুস্থ হইনা। অসুস্থ হবার মত বিলাসিতা আমার নেই। 

 

 

আমার একলা সময়

হুমায়ুন আজাদ এর একটা অসম্ভব সুন্দর কবিতা আছে। 

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
দোয়েলের শিসের জন্যে
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে
গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে
একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে
এক টুকরো মেঘের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়
হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে
এক ফোঁটা সবুজের জন্যে

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে। 

পুরোটা জুড়েই তিনি মৃত্যুর কথা বলে গেছেন। অথচ বোঝাতে চেয়েছেন বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কত কত  সুন্দর কারন রয়েছে। একদল মানুষ ক্ষমতার লোভ, অর্থের অহংকার অর্জনের জন্য বেঁচে থাকে। অথচ আমাদের বেঁচে থাকাটাই এক বিস্ময়। 

ফুলের পাপড়ির উপর জমে থাকা একটা শিশিরবিন্দু দেখেও মন আপ্লুত হতে পারে। আকাশের মেঘ দেখে মন চাইতে পারে আরেকটু বেঁচে থাকি এই বর্ষার কদম দেখার জন্য।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার মৃত্যুটা কেমন হবে! 

খুব সম্ভবত আত্মীয় পরিজন, পরিচিত মানুষ, চেনা মুখের বন্ধু ছাড়া নির্জন শীতল কোন ঘরে। যদিও খুব করে চাই মৃত্যুর আগে আমাকে ঘিরে থাকুক পরিচিত পরিবেশ আর প্রিয় কোন মুখ।

মৃত্যুকে রোমান্টিসাইজ করতে চাই না। একলা থাকতেও আমার ভয় নেই। তবু কোথাও যেন একটা অভিমান লুকিয়ে থাকে।

যা কিছু আছে বিলিয়ে যাই
আমার সময় নাই, সময় নাই
দেখা হয়নি, বলা হয়নি যা ছিল গোপন
একটা মানুষও পেলামনা আপন

জীবনটা খুব সুন্দর, অনেকদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এত অল্প সময়ে কত কিছুই দেখা হয়না করা হয়না। শুধু সময় নষ্ট করে যাই।